|
বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সূচকে গত বছরের অবস্থান থেকে ১০ ধাপ নিচে নেমে গেছে বাংলাদেশ। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্নীতি, বিনিয়োগ সমস্যা, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা কমে যাওয়া, সুশাসন, পুঁজিবাজার, সংসদ অকার্যকর ও অলিখিত লেনদেনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবনমন হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সক্ষমতা সূচকে পিছিয়ে পড়েছে।
তবে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, সন্ত্রাস, চুরি, ডাকাতি হ্রাসসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে।
বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সূচকে পিছিয়ে পড়ায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এজন্য এখনই আর্থিক খাতের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি কমানো ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।
বুধবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ধানমন্ডির কার্যালয়ে ‘বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতা রিপোর্ট ২০১২-১৩ এবং বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিবেশ ২০১২’ প্রকাশ করা হয়। সারা বিশ্বের ১৫৪টি দেশে বুধবার একযোগে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এটা ১২তম প্রতিবেদন। গত ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশ ১০ ধাপ নিচে নেমে গেছে। গত ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৮তম। কিন্তু চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের র্যাঙ্কিং হচ্ছে ১১৮তম। বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের এই অবস্থান। আর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সূচকে প্রথম স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, দ্বিতীয় অবস্থানে সিঙ্গাপুর এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড। প্রতিয়োগিতার সক্ষমতা সূচকে পিছিয়ে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্রও। এই দেশটি ৭ম অবস্থানে রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে।
তবে ভাল উৎপাদন, উচ্চ প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমবাজার, উন্নত গবেষণা, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, সরকারী-বেসরকারী খাতের উন্নয়ন এবং আর্থিক খাত শক্তিশালী হওয়ার কারণে স্ইুজ্যারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সূচকে বরাবর এগিয়ে রয়েছে।
আর প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় চীনের অবস্থান ২৯, ভারত ৫৯, পাকিস্তান ১২৪, নেপাল ১২৫, শ্রীলঙ্কা ৬৮, মালয়েশিয়া ২৫, থাইল্যান্ড ৩৮, ব্রাজিল ৪৮, ইন্দোনেশিয়া ৫০, ফিলিপিন্স ৬৫, রাশিয়ান ফেডারেশন ৬৭, কলম্বিয়া ৬৯ এবং ভিয়েতনাম রয়েছে ৭৫তমে। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশই বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মতামতের ভিত্তিতে রিপোর্ট করা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন বাংলাদেশে ব্যবসায় করতে গেলে কিছু মৌলিক সমস্যা এসে হাজির হয়। এগুলো হচ্ছে পর্যাপ্ত অবকঠামো না থাকা। দুর্নীতি ও আর্থিক সুবিধা না পাওয়া। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও সমস্যা রয়েছে। আমদানিতে শুল্ক-অশুল্কজনিত সমস্যা, দীর্ঘসূত্রতা, বর্ডার পয়েন্টে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকা এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া রফতানির জন্য সম্ভাবনাময় বাজার খোঁজার কাজ শুরু হলেও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল প্রাপ্তির দুর্বলতা রয়েছে।
সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটা সিপিডির কোন নিজস্ব রিপোর্ট নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সঙ্গে একযোগে সিপিডি এই রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। তবে এই রিপোর্ট প্রস্তুতে বিশ্বের ১৪ হাজার ব্যবসায়ীর মতামত নেয়া হয়েছে। আর মতামত নেয়ার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে মৌল, দক্ষতা ও উৎকর্ষকে। বাংলাদেশে মূলত যাদের মূলধন কমপক্ষে ১০ কোটি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ও যারা সেবা খাতের সঙ্গে জড়িত তাদের মতামত নেয়া হয়েছে। রিপোর্টটি উপস্থাপন করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আর এর মূলে রয়েছে আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে পুঁজিবাজার এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর ভূমিকা নিতে না পারায় সঙ্কট প্রকট হচ্ছে। এখানে দুর্বল সূচকগুলো আরও দুর্বল হচ্ছে। পুঁজিবাজারে এডিবি যে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল তা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
এছাড়া ধনী-গরিবের আয় বৈষম্য বাড়ছে। দেশে অলিখিত লেনদেন ও ঘুষ প্রদান বাড়ছে। এছাড়া বিদ্যুত সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। রয়েছে গ্যাস সঙ্কটও। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বেশি নজর দেয়া প্রয়োজন। সিপিডির সম্মানিক ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সম্প্রতিক দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতার বড় পতন হয়েছে। আমরা যেন নিজেদের কাছে নিজেরা হেরে যাচ্ছি। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। অন্যরা দৌড়াচ্ছে আমরা হাঁটছি, কিন্তু আমরা যেন একবারে নিশ্চল না হয়ে পড়ি। রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমানও বক্তব্য রাখেন।
|