২০১০ সালের শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী, সাবেক মন্ত্রী ও বিশেষজ্ঞরা। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত 'জাতীয় বাজেট ২০১২-১৩ পর্যালোচনা' শীর্ষক সংলাপে তাঁরা এসব দাবি করেন। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এ সংলাপে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাঈদুজ্জামান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারকে উদ্দেশ করে বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। আপনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি। একই সঙ্গে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। আপনি শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি।'
পরিকল্পনামন্ত্রীকে আলটিমেটাম দিয়ে ড. কামাল বলেন, 'আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের আপনি বিচারের আওতায় নিয়ে আসুন।'
সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না। বেসরকারি সংস্থা সিপিডি এ বিষয়ে কথা বলতে চায় না। শেয়ারবাজারে ফতুর হওয়া মানুষগুলোর বিষয়ে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
মেনন অভিযোগ করেন, সংসদে বাজেট নিয়ে কম আলোচনা হয়; যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হবে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর কারণে আগামী অর্থবছরে কৃষি খাতের সাফল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শেয়ারবাজার দুষ্ট বলে অর্থমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন এর কঠোর সমালোচনা করে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শেয়ারবাজার কখনো দুষ্ট হতে পারে না। আসলে এখানে কিছু দুষ্ট লোক কাজ করছে। আমীর খসরু বলেন, ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। কারণ তারা অনেক শক্তিশালী। শেয়ারবাজার নিয়ে এখনো একটি গ্রুপ কাজ করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এসইসি, দুদক ও বিটিআরসির মতো রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না বলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হারও উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে। আবার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। এতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলমানি সুদের হারও বাড়ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও গুণগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। এসব দিক বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। মির্জ্জা আজিজ বলেন, 'আমার ভবিষ্যদ্বাণী যদি ভুল হয়, তাহলে আমি হব পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।'
সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম বলেন, সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলেও প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি খাতের বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। দারিদ্র্য দূর করতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বড় নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে ৫২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশই ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। মন্ত্রী বলেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আগামী অর্থবছরে ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো। রেমিট্যান্সের পরিমাণ ইতিমধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার হার ভালো হচ্ছে।
|