প্রধান বিরোধীদল বিএনপির অনুপস্থিতিতেই জাতীয় সংসদে আগামী রবিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০১২-১৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে স্পিকার আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার এই বাজেট প্রস্তাব কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীগণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৬টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এই মঞ্জুরি দাবি প্রস্তাবগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এসব দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে মোট ৮৪৭টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। এর মধ্যে ৮টি দাবির ওপর স্বতন্ত্র সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করে বক্তব্য দেন। পরে তার উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। ফজলুল আজিমের মোট ৫৬ ছাঁটাই ছিল। বিরোধী দলের অন্য সদস্যগণ সংসদে অনুপস্থিত থাকায় তাদের ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো সংসদে উত্থাপিত হয়নি। এর পর সংসদ সদস্যগণ টেবিল চাপড়িয়ে নির্দিষ্টকরণ বিল-২০১২ পাসের মাধ্যমে ২০১২-’১৩ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন করেন।
বিরোধী দল বিএনপি সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু দিন থেকে পাসের দিন পর্যন্ত সংসদে অনুপস্থিত থেকে বাজেট আলোচনা এবং বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। গত ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেন। গত ১২ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও অন্যান্য মন্ত্রীসহ সরকারি দলের সদস্যগণ ১২ কার্যদিবসে প্রায় ৪৭ ঘণ্টা বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর এটি চতুর্থ বাজেট।
বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া, এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৪ শতাংশ। কর বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২২ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.২ শতাংশ।
বাজেটে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটে নতুন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাজেটে সার্বিক বাজেট ঘাটতি ৫২ হাজার ৬৮ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ১৮ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে ৩৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৩ হাজার কোটি এবং ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ১০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাজেটে কৃষি, শিক্ষা, দারিদ্র নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এ তিনটি খাতের উন্নয়নের ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাস করা বাজেট ৩০ জুন সমাপ্য অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ২৮ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩০ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা বেশী।
২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেট ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। গতকাল সংসদে অর্থবিল ২০১২ পাস করা হয়েছে। বিলে শতকরা ১০ ভাগ কর প্রদানের মাধ্যমে শেয়ারবাজারসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ রাখার বিধান করা হয়েছে। বিলে আবাসন খাতে এবং রফতানির ওপর উৎসে কর হ্রাস করার বিধান করা হয়। ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ করা হয়। মহিলা ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে তা ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া বিলে মোবাইল কলে উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৭০ লাখ টাকা টার্নওভারের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রত্যাহার করে টার্নওভার ট্যাক্স বহাল রাখা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ওপর করমুক্ত রাখা, মোবাইল এবং কম্পিউটারের সফটওয়্যারের ওপর কর প্রত্যাহার এবং ১৯ ইঞ্চি পর্যন্ত কম্পিউটার মনিটর করমুক্ত রাখা হয়েছে।
বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট বরাদ্দের ২৪.২ শতাংশ, এর ২০.৫ শতাংশ মানবসম্পদ খাত ও ভৌত অবকাঠামো খাতে ২৭.৮ শতাংশ ধার্যকরা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১৪.৯ শতাংশ, বৃহত্তর যোগাযোগ খাতে ৭ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া বাজেটে সাধারণ সেবা খাতে মোট বরাদ্দের ১৯ শতাংশ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ব্যয় বাবদ ৪.৯ শতাংশ বরাদ্দের রাখা হয়েছে। এছাড়া সুদ পরিশোধ বাবদ ১২.২ শতাংশ, নীট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ অবশিষ্ট ১১.৭ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাজেটে মানব সম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
নতুন বাজেটে মানব সম্পদ উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ৩৯ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা, সড়ক যোগাযোগ ও রেল পথ খাতে ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৯ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৯ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয় খাতে ৮ হাজার ৯১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও পানি সম্পদ খাতে ২ হাজার ৮৯০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাজেটে আবাসন ও পূর্ত খাতে ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, ২৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া খাতে ৬৮৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি নিশ্চিত প্রস্তাবিত বাজেট এবং গত তিন বছরের অর্জন আমাদের অর্থনীতির জন্য এমন ভিত্তিভূমি তৈরি করে সুখী, সমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রাকে সহজতর করবে। সাথে সাথে দেশ ও জাতিকে সঠিক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নেবে।’